এম. কে.সি.এম স্কুলের আব্দুল আওয়াল মাস্টার

রাজেশ গৌড় রাজেশ গৌড়

দুর্গাপুর,নেত্রকোনা

প্রকাশিত: ৮:২০ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২০

অধ্যক্ষ ফারুক আহমেদ তালুকদার

অভ্যাস ভয়ানক জিনিস। একে আয়ত্ব করা যতটুকু কঠিন ত্যাগ করাও ততটুকু কঠিন। এর ব্যত্যয় হলে জীবের দেহ মনে অস্থিরতার জন্ম দেয়। ফজরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা আব্দুল আওয়াল মাস্টার সাহেবের দীর্ঘ দিনের অভ্যাস। আজ ফজরের নামাজের জামায়াত ছুটে যাওয়ায় তাঁর দেহ ও মন সকাল থেকেই অস্থির লাগছে। শিক্ষকতাকে তিনি ব্রত মনে করেন। স্কুলের কাজের ব্যস্ততায় অধিক ঝুঁকে পরলে তাঁর সহকর্মী সহকারী শিক্ষক দীলিপ মুজুমদার বাবু সাধারণত জামায়াতের টাইম স্মরণ করিয়ে দেন। দীলিপ মুজুমদার বাবু অসাম্প্রদায়িক মনের উদার মানুষ। অজানা কারণে সুসঙ্গ এর সমবয়স্ক এবং ছোটদের প্রায় সবাই তাঁকে দীলিপ স্যার বলে ডাকে। দীলিপ মুজুমদার বাবু মহারাজা কুমুদ চন্দ্র (এম.কে.সি.এম) স্কুলের প্রাক্তন হেড মাস্টার জনাব শামছুদ্দিন ফকির স্যারের খুব প্রিয় মানুষ। হেড মাস্টার শামছুদ্দিন ফকির শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে সরকারী চাকুরীতে প্রবেশের প্রাক্কালে তাঁর কাছের বন্ধু আব্দুল আওয়াল সাহেবকে তাঁর কর্মস্থলে নিয়োগের চিন্তা করেন, এর পেছনে একটা ইতিহাস আছে- ১৯৬৬ সালে ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে সতীর্থ কলেজ বন্ধু আব্দুল আওয়াল শামছুদ্দিন ফকির মাস্টার সাহেবের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। বেড়াতে এসে সুসঙ্গ এর সোমেশ্বরী নদীর মহাসোল আর নানিদ মাছের স্বাদ এবং পড়ন্ত বিকালে গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য তাঁকে মুগ্ধ করে। সামাজিক সৌজন্যতায় পরদিন সকালে শামছুদ্দিন ফকির সাহেব নিজ কর্মস্থল এম.কে.সি.এম স্কুলে তার বন্ধুকে নিয়ে অফিস কক্ষে হাজির হন। স্কুল অফিসে পরিচয় পর্বের এক পর্যায়ে শামছুদ্দিন ফকির সাহেব সকল সহকর্মীকে বলেন, আমি সরকারী চাকুরীতে চলে যাচ্ছি। আপনাদেরকে খুব ভাল একজন হেড মাস্টার দিয়ে যেতে চাই, আপনাদের আপত্তি না থাকলে স্কুলের সেক্রেটারি বাবু দূর্গাপ্রসাদ তেওয়ারী ও দূর্গাপুরের সার্কেল অফিসার (সি.ও)-কে বলতে পারি। সবাই রাজি হয়ে গেল। পরদিন সোমেশ্বরী নদীর দুইটি মহাসোল ও নানিদ মাছ নিয়ে আব্দুল আওয়াল সাহেব নিজ বাড়ি ফিরলেন। মাছ খেয়ে আব্দুল আওয়াল সাহেবের ছোট মেয়ে লীলাবতী এবং তার বৃদ্ধা মা আয়েশা বেগম ভীষণ খুশি। দু’মাস পর স্কুলের সেক্রেটারি বাবু দূর্গাপ্রসাদ তেওয়ারির বদান্যতায় যথাযথ ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষে আব্দুল আওয়াল সাহেব এম.কে.সি.এম স্কুলের হেড মাস্টার পদে কর্মে যোগ দিলেন।। গত চার বছরে এম.কে.সি.এম স্কুলের মেট্টিক পরীক্ষার রেজাল্ট ক্রমশ উন্নতির দিকে যাচ্ছে। তারপরেও আব্দুল আওয়াল মাস্টার সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন। কেননা যারা মেট্টিক পাস করছে, তারা কলেজে ভর্তি হবে কোথায়? সুসঙ্গ দূর্গাপুর কিংবা আশেপাশে কোথাও কোন কলেজ নেই। তবে সুখের কথা সম্প্রতি গুজিরকোণা গ্রামে “কিষাণ কলেজ” নামে একটা নতুন কলেজ স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু অসুবিধা হচ্ছে থানা সদরের শিক্ষার্থীরা কলেজে পড়ার জন্য গ্রামে যেতে চাইবে না। সবাই ভাল লেখা পড়ার জন্য শহরমুখী হবে। এই ভেবে তিনি বিষয়টি সমাধানে তাঁর সহকর্মী দীলিপ বাবুর সহায়তা চাইলেন। দীলিপ স্যার হাল ছেড়ে দিলেন। কিন্তু গফরগাঁও গোলন্দাজ পরিবারের সংস্পর্শে বড় হওয়া সংশপ্তক শিক্ষা ব্রতি আব্দুল আওয়াল মাস্টার সাহেব নাছোড়বান্দা হিসাবে দীলিপ বাবুকে বলেন আপনি স্থানীয় লোক, সবাই আপনাকে সম্মান করে, কাজেই এলাকাবাসীর সহযোগীতা নিয়ে মহারাজা কুমুদ চন্দ্র স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাদের পরিত্যাক্ত বসত ভিটার “রঙমহল”-টিতে স্বপ্নের কলেজটি স্থাপন করা যেতে পারে। তাঁর এই প্রস্তাব ও উদ্যোগের ফলাফল হিসাবে ১৯৭০ সালে গণপরিষদ নির্বাচনের পূর্বেই চালু হয়ে যায় “সুসঙ্গ মহাবিদ্যালয়”। আজ আব্দুল আওয়াল সাহেবের মন অস্থির লাগার পিছনে আরো একটি কারণ রয়েছে- তিনি সুবেহ্ সাদিকের সময় স্বপ্নে দেখেছেন তাঁর স্কুলের সরকারি পতাকার পাশাপাশি আরো একটি নতুন পতাকা উড়ছে! এই স্বপ্ন কীসের ইঙ্গিত? তবে কী সোনার বাংলা স্বাধীন হতে চলছে? বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের অগ্নিঝরা ভাষণ তিনি শুনেছেন। এমুহুর্তে তাঁর মন ভাল হয়ে গেছে। তিনি স্কুলের পাঞ্জেখানা মসজিদে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন, নামাজ শেষে মা বাবার জন্য দো’য়া করলেন -“রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বায়ানি ছাগিরা” ।

মুক্তিযুদ্ধ পুুরো দমে শুরু হয়ে গেছে। সবাই যার যার জায়গামত পজিশন/আশ্রয় নিয়েছে। জারিয়া-ঝানজাইল ইষ্টিশনে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় আব্দুল আওয়াল মাস্টার সাহেব তাঁর বেড়াতে যাওয়া পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না। গত সপ্তাহে বাড়ি থেকে একটি চিঠি এসেছে, চিঠির খামটি খুলে দেখা গেল খামের ভেতরে তিনটি পত্র। তিনি কচি হাতের লেখা তাঁর ছোট্ট মেয়ের পত্রটি আগে পড়তে লাগলেন -“বাপজান, দাদির ঘরের চালের ফোটা দিয়ে পানি পরে, আমার ছড়ার বই ভিজে গেছে, এই বার বাড়ি আসার সময় আমার পুতুলের জন্য একটা টুকটুকে টিয়া লাল রঙের জামা আর দাদির জন্য মহাসোল মাছ নিয়ে এসো”। আওয়াল মাস্টার সাহেবের দু’চোখ জলে ভিজে যায়। আহ্! মেয়েটার মত তিনি নিজেও জানেন না, জারিয়া-ঝান্জাইল রেল ষ্টেশনের রেল গাড়িটা আবার কবে আসবে?- কবে দেখা হবে?

বিরিশিরি হানাদার ক্যাম্পের মেজর সুলতান, আব্দুল আওয়াল মাস্টার সাহেবকে স্কুল খোলা রাখার তাগিদ দিয়েছে। তাই অজানা ভয়ে গত কদিন যাবৎ তিনি স্কুলের পাশেই থাপনারগাতি গ্রামের ছাবেদ মড়লের বাড়িতে রাতের বেলায় ঘুমান। মে মাসের মাঝামাঝি কোন এক সন্ধ্যা রাতে আনুমানিক পাঁচ ছয়জন মেলেটারির একটা দল ছাবেদ মড়লের বাড়ি থেকে আব্দুল আওয়াল মাস্টার সাহেবকে দুই হাত চোখ বেঁধে বিরিশিরি ক্যাম্পে নিয়ে এসে একটি কক্ষে ধাক্কা মেরে ফেলে দরজা বন্ধ করে দেয়। রক্ত গন্ধে ভরপুর কক্ষটিতে অস্ফুট সরে কে যেন পানি পানি করে চিৎকার করছে। চিৎকার করা ব্যক্তির কন্ঠ আব্দুল আওয়াল সাহেবের নিকট চেনা চেনা লাগছে। তিনি তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির পরিচয় জিজ্ঞাস করে অবাক হয়ে গেলেন, তৃষ্ণার্ত ব্যক্তিটি পূর্ব কাকৈরগড়া প্রাইমারি স্কুলের জালাল উদ্দিন তালুকদার মাস্টার সাহেব। জালাল মাস্টার সাহেবের বড় ভাই মাফিজ উদ্দিন তালুকদার মাস্টার সাহেব তাঁর কাছের বন্ধু। জালাল মাস্টার তাঁর বড় ভাইয়ের বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন- এরা আমাকে ধরে নিয়ে এসেছে, মারধর করছে, অনেকক্ষণ যাবৎ পানি চাচ্ছি এরা আমাকে পানিটুকুও দিচ্ছে না, আমাকে এরা এত শাস্তি দিচ্ছে কেন? আমিতো আমার অপরাধ জানি না। হ্যাঁ, আমার ছোট ভাই জমির উদ্দিন তালুকদার মুক্তিযুদ্ধ করছে, এটা তো আমার অপরাধ না, এটা আমার অহঙ্কার- এই বলে তিনি সম্ভবত বেহুশ হলেন। আব্দুল আওয়াল মাস্টার সাহেবও তাঁর শাস্তির কারণ জানেন না, তিনি ভাবতে লাগলেন, তাঁর ছোট পরিবারের কেউ তো মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেনি তবে তাঁকে কেন ধরে আনা হয়েছে? তিনি নিজের পরিবার পরিজনের হক নষ্ট করে সুসঙ্গ বাসির জন্য ছদকায়ে জারিয়া হিসেবে নিজ হাতে স্কুল গড়েছেন, কলেজ তৈরী করেছেন তবে এটাই কি তাঁর অপরাধ? তিনি দোয়া ইউনুছ পড়তে লাগলেন।

ভোর বেলায় যখন জ্ঞান ফিরল তখন রক্ত মাখা ফোলা চোখে জালাল মাস্টার দেখলেন তাঁর বাম পাশেই মেঝোতে পরে গোঙাচ্ছে বড় ভাইয়ের বন্ধু আব্দুল আওয়াল ভাই, আব্দুল আওয়াল ভাইয়ের দুই হাতের সবকটি আঙ্গুল কেটে ফেলা হয়েছে, রক্ত গড়িয়ে মেঝেতে পরছে , এমন সময় পাক মেজর সুলতান বদ্ধ ঘরের দরজা খুলে উর্দূতে কিছু একটা বলে সাথে সাথে বের হয়ে গেল। কয়েক মিনিট পর ঘরে বন্দি সাত/আট জনকে চোখ বেঁধে মেলেটারি জীপে তুলে নিয়ে বিরিশিরি আকঞ্জি বাড়ির পিছনে সোমেশ্বরী নদীর তীরে এক লাইনে সবাইকে দাঁড় করানো হলো। আব্দুল আওয়াল মাস্টার সাহেব জোরে জোরে পাক কালিমা পড়তে লাগলেন। হঠাৎ ব্রাশ ফায়ারের শব্দ। সোমেশ্বরীর প্রবাহমান রক্ত স্রোতের সাথে কয়েকটা লাশ ভেসে যায় বর্তমান চৈতাটি ঘাটের সাখাইয়া বিলে।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধোত্তর অসম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশে সর্ব-সাধারণের সমর্থনে মহারাজা কুমুদ চন্দ্র স্কুলের প্রবেশ দ্বারে শহীদ আব্দুল আওয়াল স্যারের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত হয় “আব্দুল আওয়াল স্মৃতি তোরণ”। শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের উত্তর সূরী সন্তান হিসাবে আমাকেও অন্যান্যদের সাথে প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর বিরিশিরি বধ্য ভূমির স্মৃতি সৌধে শ্রদ্ধার্ঘ্য দিতে যাওয়া হয়, যেতে হয় কিন্তু যাওয়া হয় না বর্তমান এম.কে.সি.এম স্কুলে। একবুক অভিমান আর কষ্ট। স্বাধীন দেশে স্বাধীন বেশে ঐতিহ্যবাহী এম.কে.সি.এম স্কুলে না যেতে পারার কষ্ট যে বড় তীব্র। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ আব্দুল আওয়াল স্যারের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত স্কুলের সুন্দর মূল ফটক টি সম্প্রতি সুপরিকল্পিত ভাবে অজানা এক গোষ্ঠী, এক অশুভ শক্তি বন্ধ করে দিয়েছে। যে পাঞ্জেখানা মসজিদে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নামাজ আদায় করত সেটাও বন্ধ করা হয়েছে। ইদানিং নতুন প্রজন্মের চোখ সরিয়ে দেয়ার জন্য মূল পাকা রাস্তার গেইট বন্ধ করে এম.কে.সি.এম স্কুলটির পিছনের পশ্চিম দেওয়াল কেটে ধান ক্ষেতের মধ্যে একটি কাচা রাস্তায় বিকল্প ফটক গড়ে উঠেছে। স্কুলের পাশেই ঋষিদের (হরিজন সম্প্রদায়) পূর্ব পুরুষের পুরাতন বসতি এবং খাস জমিতে গড়ে উঠেছে পাকা মসজিদ ও মন্দির। সাখাইয়া বিল ভরে উঠেছে লক্ষ কোটি রক্ত লাল শাপলা আর আগাছায়। প্রতিদিন শত শত দর্শক রক্ত লাল শাপলা দেখতে আসে। তবে আগাছার আধিক্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে স্যারের মেয়ে লীলাবতীর প্রিয় সোমেশ্বরীর মহাসোল আর নানিদ মাছ, যেমন বিলীন হয়ে যাচ্ছে স্বাধীন সার্বভৌম অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের “শহীদ আব্দুল আওয়াল স্মৃতি তোরণ।”