কুকুরপ্রেমী একদল তরুণ

রাজেশ গৌড় রাজেশ গৌড়

দুর্গাপুর,নেত্রকোনা

প্রকাশিত: ১:৩৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০২১

কিংশুক পার্থ
খাবার নিয়ে ছুটছে একদল তরুণ। তাদের কেউ মাধ্যমিকে কেউবা উচ্চ মাধ্যমিকে পড়েন। করোনার থাবা থেকে কুকুরসহ অন্যান্য প্রাণিকে বাঁচাতে নিজ উদ্যোগে এগিয়ে এসেছে এসব তরুণ। নেত্রকোনা বিভিন্ন সড়ক ঘুরে যেখানে অসহায় কুকুর, বিড়াল ও অন্যান্য প্রাণি করোনার এসময়ে খাবার থেকে বঞ্চিত তাদের খাবার দিয়ে আনন্দ পাচ্ছেন তারা। তাদের এ কাজকে সংঘবদ্ধ করতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘পেট রেস্কিউ টিম’ নামে একটি সংগঠন যা নেত্রকোনায় প্রথম।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনা মহামারীর কারণে নেত্রকোনা জেলার প্রায় সকল হোটেল, রেস্তুরা বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়ে ওই সব প্রাণী। মানুষের খাবারের ব্যবস্থা কোন রকম হলেও প্রাণিদের নিয়ে কেউ ভাবছেন না। খাবার অভাবে নিদারুণ কষ্টে দিনযাপন করা ওইসব অসহায় প্রাণিকে চোখের সামনে কাতরাতে দেখে বিষন্ন হন খান মাহবুব আলম আবিদ (১৯)। কলেজ বন্ধ, পড়াশুনার চাপ কম তাই আবিদ বিষয়টি অনুধাবন করে বন্ধু ও ছোট ভাইয়ের সাথে আলাপ করে গঠন করেন ‘পেট রেস্কিউ টিম’ নামে একটি সংগঠন। শুরু হয় কার্যক্রম। শুরুতে সমমনা চারজন প্রাণিপ্রেমীকে নিয়ে যাত্রা। এই গ্রুপের সংগঠক খান মাহাবুব আলম আবিদের সাথে যুক্ত হন ১০ শ্রেণীর শিক্ষার্থী ঈশিতা জাহান ঈশা(১৫), আকাশ সাহা (১৬), অরণ্য কিশোর দে (১৭)। প্রথম অভিযানের পর এটি এখন দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে। ফেসবুকে পেইজ খুললে মিলে দারুন সাড়া।


শুরুতে পরিবার থেকে সমর্থন না করলেও ওদের আগ্রহ দেখে এগিয়ে আসেন নিজেদের আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধব। অরণ্য মা মালী রানী পাল তো বলে বসেন ‘বাসায় একটা কুকুর থাকতে আরেকটা আনার দরকার কি! তবে ছেলের আগ্রহ দেখে পরে তিনিই বলে বসেন পড়াশুনা ঠিক রেখে সবকিছু করো।
মেয়ের এমন কাজে গর্বিত ঈশার মা শারমীন আক্তার শিখা। কুকুরদের খাওয়ানোর জন্য মেয়ের পাশে দাঁড়াতে নিজ হাতে রান্না করে দিয়েছেন খাবার। তিনি জানান, ওরা স্বপ্রণোদিত হয়ে একটি ভালো কাজ করছে। সবার উচিত ওদেরকে সহযোগিতা করা। এইটুকু বয়সে ওদের মাথায় যে এটা এসেছে তাতে আমি ওদের সবাইকে নিয়ে গর্বিত।

তিন কেজি চাল, আধা কেজি ডাল, দেড় কেজি মাংসের সংমিশ্রণে রান্না করা খিচুরি প্রথম দিন প্রায় ৩০-৩৫ টি কুকুরকে খাওয়ানো হয়। শহরের ঢাকা বাসস্ট্যান্ড, হাসপাতাল রোড, জয়নগর, সাতপাই এলাকা ঘুরে এসব কুকুরকে খাওয়ানো হয় খাবার। বাজেট কম থাকায় মূলত যেসব জায়গায় খবার, উচ্ছিষ্ট কম থাকে সে এলাকাগুলো বাছাই করে তারা খাবার দিচ্ছেন বলে জানান অন্যতম সংগঠক আকাশ সাহা। তিনি জানান প্রতি শনিবার আমরা এ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি। সবার সহযোগিতা পেলে আমাদের কর্ম পরিকল্পনা বাড়বে বলেও জানান তিনি।
তবে শুধু খাবার দিয়েই ক্ষান্ত নন তারা। একই সাথে করে চলছে রেস্কিউ। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন প্রান্তে নানা ভাবে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া অসহায় প্রাণীদের খবর পেলেই উদ্ধার করে চিকিৎসা ও সেবা দেন তারা। রামপুরের ঘটনা। আমাদের কুকুর নিয়ে কার্যক্রমের ছবি সামাজিক মাধ্যমে দেওয়ার পর ঈদের পরের দিন ঢাকা থেকে কুকুর প্রেমী একজন আমাদের হেল্পলাইনে ফোন করে জানান কেন্দুয়া উপজেলার রামপুরে একটি কুকুর সড়ক দুর্ঘটনা আহতে হয়েছে। বর্তমানে রাস্তার পাশে একটি বাসায় আছে কুকুরটি। তথ্য নিয়ে তারা রামপুর থেকে কুকুরটিকে রেস্কিউ করে নিয়ে আসেন নেত্রকোনায়। পরদিন পশু হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এখনো কুকুরটিকে তারা চিকিৎসা ও খাবার দিচ্ছেন।
অরণ্য কিশোর দে বলেন, আমরা এখনো নিজ খরচে এসকল কাজ করছি। কোন অনুদান পাইনি। স্পন্সর বা প্রশাসন থেকে সাহায্য করা হলে আমাদের কর্মপরিধি বাড়াবো। যারা এ কাজে আগ্রহী তারা আমাদের সাথে যোগ দিতে পারেন।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা খান মাহবুব আলম আবিদ জানান, আমরা চাই সমাজের কেউই যেন কিছু থেকে বঞিত না হয়। অসহায় প্রাণিরাও যেন ঠিক মত বাঁচতে পারে সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। ভবিষ্যতে প্রতিটি উপজেলায় একাজ বিস্তার করা হবে বলে জানান তিনি।

বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মতীন্দ্র সরকার বলেন, ‘এটা খুব ভালো উদ্যোগ। ওরা আমাদের সমাজ ও পরিবেশের অংশ। আমি ওদের সাধুবাদ জানাই। যতটুকু পারি আমি সহায়তা করে যাবো ওদের।
জেলা প্রশাসক কাজি মোঃ আবদুর রহমান বলেন ‘‘এটি নিসন্দেহে ভালো কাজ। আমাদের তরুণদের এমন উদ্যোগ অনেককে অনুপ্রাণিত করবে। এভাবেই এগিয়ে যাবে মানবিক বাংলাদেশ। ভালো কাজে আমরা পাশে থাকবো।’###