জীবন্ত কিংবদন্তি দূর্গাপ্রসাদ তেওয়ারী

রাজেশ গৌড় রাজেশ গৌড়

দুর্গাপুর,নেত্রকোনা

প্রকাশিত: ৪:৩৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০২১

রাজেশ গৌড়

রাজনীতিবিদ, বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামী, কমরেড মণি সিংহের সহযোদ্ধা, সামরিক শাসন ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে কারা নির্যাতিত নেতা দূর্গাপ্রসাদ তেওয়ারীর ৯১তম জন্মদিন আজ । ১৯৩১ সালের ২০ আগষ্ট নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার পৌর শহরের দেশওয়ালী পাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন এ কিংবদন্তি নেতা । উনার পিতা স্বর্গীয় সারদা প্রসাদ তেওয়ারী ও মাতা শ্যামা সুন্দরী । তাদের ৭ সন্তানের ভিতর দূর্গাপ্রসাদ ছিলেন ৪র্থ সন্তান। বর্তমানে তিনিই একমাত্র জীবিত আছেন । দূর্গাপ্রসাদ তেওয়ারী ১৯৫০ সালে স্থানীয় এম কে সি এম পাইলট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস এসসি পাশ করেন । এরপর দুর্গাপুরে কেনো কলেজ না থাকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য চলে যান কলকাতায় । সেখানে গিয়ে ভর্তি হন স্কটিশ চার্চ কলেজে । কিন্ত সে জায়গায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারনে তাঁর মায়ের টেলিগ্রাফে তিনি দুর্গাপুরে চলে আসেন । ১৯৫৯ সালে ১০মে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কৃষ্ণা তেওয়ারীর সাথে ।

দূর্গাপ্রসাদ তেওয়ারী ও উনার স্ত্রী কৃষ্ণা তেওয়ারী।

সংসার জীবনে তাঁর স্ত্রী, বর্তমানে ২ ছেলে, ১ মেয়ে এবং নাতী-নাতনী রয়েছে । বড় ছেলে বর্তমানে কানাডার সিটিজেন এবং সেখানে চাকুরী করছেন। ছোট ছেলে রূপক তেওয়ারী বাড়িতে থেকে ব্যবসা বানিজ্য করছেন।

দূর্গাপ্রসাদ তেওয়ারীর দুই ছেলে ও নাতী- নাতনী।

তাঁর একমাত্র মেয়ে রঞ্জনা তেওয়ারী বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাম রাজনীতিতে যুক্ত আছেন।

দূর্গাপ্রসাদ তেওয়ারীর মেয়ে ও নাতী।

দুর্গা প্রসাদ তেওয়ারী ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন । ছাত্র জীবনেই তিনি কমরেড মণি সিংহের সানিধ্য পান এবং কমরেড মণি সিংহের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে টংক আন্দোলন, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। দূর্গাপ্রসাদ তেওয়ারীর আদর্শিক নেতাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,কমরেড মণি সিংহ, , ন্যাপ নেতা মোজাফর আহম্মেদ, ন্যাপ নেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য, কমরেড ফরহাদ, কমরেড মঞ্জুরুল আহসান খান অন্যতম। ১৯৬৫ সালে পাকভারত যুদ্ধের সময় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। ১৯৭০ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন । নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর সাথে লড়াই করে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে যে টংক আন্দোলন শুরু হয়েছিল সেই টংক আন্দোলনে তিনি সার্বিক সহযোগিতা করতেন। ১৯৭১ এর পর কমরেড মণি সিংহ যখন দুর্গাপুর আসেন তখন কমরেড মণি সিংহের বাড়িঘর ভেঙ্গে দেওয়ার ফলে বাড়িঘর না থাকায় দুর্গাপ্রসাদ তেওয়ারীর বাসায় উঠতেন এবং রাজনৈতিক কাজ পরিচালনা করতেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্ব-পরিবারে হত্যা করার পর হত্যার প্রতিবাদ করার জন্যে ১৯৭৫ সালের ৪ ডিসেম্বর তাঁকে বন্দি করে ময়মনসিংহে জেলে রাখা হয় এই সময়ে তাঁর সাথে বর্তমান রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ, তোফায়েল আহম্মেদ এবং , অধ্যাপক যতীন সরকার, কমরেড মৃণাল বিশ্বাস, আশুতোষ সাহা, অধ্যাপক রিয়াজুল ইসলাম সহ আরও অনেকেই একই সাথে জেলে ছিলেন। জেলে থাকাকালীন সময়ে তাঁর স্ত্রী কৃষ্ণা তেওয়ারী ১২ কি.মি. পায়ে হেটে জারিয়া রেলস্টেশনে এসে ট্রেনে করে মাসে দুইবার তাকে দেখতে যেতেন। রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে আন্তরিকভাবে সব বিষয়ে সহযোগিতা করেন স্ত্রী কৃষ্ণা তেওয়ারী । দূর্গাপ্রসাদ তার সারাটি জীবন মানুষের অধিকার সংগ্রামের জন্য লড়াই করেছেন ।

দূর্গাপ্রসাদ তেওয়ারীর বড় ছেলে ও নাতনী।

দুর্গাপ্রসাদ তেওয়ারী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি(ন্যাপ) এর রাজনীতি করতেন এবং উপজেলা কমিটির সভাপতি ছিলেন । তিনি বামপন্থী নেতাদের কাছে আজও অভিভাবকতুল্য । বর্তমান বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এর সাথে রয়েছে উনার দীর্ঘদিন এর আন্তরিক ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক। তিনি দীর্ঘদিন কৃষক সমিতির সভাপতি, বিআরডিবির চেয়ারম্যান ছিলেন । এ ছাড়াও তিনি সুসং মহাবিদ্যালয়, দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ তৈরীতে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন এবং শতবর্ষী এম কে সি এম পাইলট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়েরও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও কমরেড মণি সিংহের যে সততা ও আদর্শ ছিল তিনি তা অনুসরন করে সর্বদাই সৎ থেকেছেন। তিনি চাইলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনেক অর্থের প্রাচুর্য গড়তে পারতেন কিন্তু তা তিনি করেননি বিধায় আজ তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত ও গ্রহনযোগ্য ।

বর্তমানে বয়সের ভারে উনার ডায়াবেটিক সহ অন্যান্য রোগব্যাধি শরীরে দেখা দিয়েছে । ২০০৭ সাথে হার্টে ব্লক ধরা পরায় ঢাকা ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা করেন। বর্তমানে তিনি শ্বাসকষ্ট ও কিডনী জনিত সমস্যায় ভুগছেন।

দূর্গাপ্রসাদ তেওয়ারী।

তিনি নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বুকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।